-->

করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ কি পর্যাপ্ত ?

লেখক : নিজাম উদ্দিন ইমরান 
cdc-w9KEokhajKw-unsplash.jpg

বাংলাদেশে সরকার করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাংলাদেশের মানুষদের সচেতনের জন্য নেয়া সব পদক্ষেপ পর্যাপ্ত। তাহলে ও ভুল হবে। আবার যদি বলা হয় বাংলাদেশের সরকার কিছুই করছে না, তাহলেও ভুল হবে। কারন সরকার এক এক সময় এক এক রকম কথা বলছে। সরকার বলেছিল তারা প্রস্তুত আছে, কিন্তু পরে তারা বলছে যে তাদের এটা, ওটা নেই, ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে বাংলাদেশে সেনাবাহিনী মাঠে আছে, পুলিশ মাঠে আছে, তারা মানুষকে সচেতন করার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করছে।গণ সচেতনার অভাব থাকায় ফলাফল আশানুরূপ হবে মনে হয় না। পাড়া মহল্লায় ব্যপক পচার সহ করা নজরদারি রাখলে সরকারি সকল সিদ্ধান্ত সফল হবে বলে মনে করা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ভাইরাসটির সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারত আর পাকিস্তানে করোনা রোগী প্রথম শনাক্তের পর যথাক্রমে ৬৭ (৫ই এপ্রিল) এবং ৪১তম দিন (৬ই এপ্রিল) পার হওয়ার পর সর্বোচ্চ সংখ্যক, যথাক্রমে ৭০১ ও ৬০৯ জন রোগী শনাক্ত হয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, গত ১-২ দিনে এই হার কম। হতে পারে দেশগুলির প্রশাসন লোকজনের গতিবিধি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। আমরা কেবল ৩২তম দিন পার করছি। গত চার দিনে অর্থাৎ ৫, ৬, ৭ ও ৮ই এপ্রিল আমাদের দেশে শনাক্তের সংখ্যা যথাক্রমে ১৮, ৩৫, ৪১ ও ৫৪ জন। তার মানে এখানে সংক্রমণের গতি পেয়েছে, নতুন নতুন স্থান যুক্ত হচ্ছে। হতে পারে আমাদের ল্যাবরেটরি পরীক্ষার পরিধি বেড়েছে, তাই শনাক্তের সংখ্যাও বাড়ছে। আগে যেখানে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা করার অনুমোদন পেয়েছিল, এখন সেখানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী ও সিলেটসহ ১৪টি ল্যাবে রোগীদের মধ্যে ভাইরাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হচ্ছে। এরপরও এটা অপ্রতুল। কারণ আক্রান্তের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে ভাইরাসের গতি প্রকৃতি, কোনো এলাকার জনসাধারণকে কীভাবে এবং কত দিন নিয়ন্ত্রণের দরকার, যেটা নীতিনির্ধারণসহ নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেক সাহায্য করে।
বাংলাদেশে প্রতি হাজারে মাত্র ০.০২ জনের মধ্যে ভাইরাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়েছে। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই মৃত্যুহারে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়ে আমরা অনেক এগিয়ে

করোনা সন্দেহ বা আক্রান্ত হলে কি করবো ?
● দেখতে হবে আক্রান্ত ব্যক্তি যাতে যথেষ্ট বিশ্রাম পান, পুষ্টিকর খাবার খান, প্রচুর পানি আর তরল পান করেন।

● দেখতে হবে আক্রান্ত ব্যক্তি যাতে যথেষ্ট বিশ্রাম পান, পুষ্টিকর খাবার খান, প্রচুর পানি আর তরল পান করেন।

● একই ঘরে যখন সেবা কাজে, তখন মেডিকেল মাস্ক পরবেন দুজনে। হাত দিয়ে মাস্ক ধরবেন না। মুখে হাত দেবেন না। কাজ শেষে মাস্ক ফেলে দেবেন ময়লার ঝুড়িতে।

● বারবার হাত ধোবেন সাবান পানি দিয়ে বা স্যানিটাইজার দিয়ে: অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে বা এর চারপাশের সংস্পর্শে এলে খাবার তৈরির আগে, খাবার খেতে বসার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর।

● অসুস্থ মানুষের জন্য আলাদা বাসনপত্র, তোয়ালে, বিছানার চাদর—এসব জিনিস সাবান দিয়ে ধুতে হবে। অসুস্থ ব্যক্তি যা যা হাত দিয়ে স্পর্শ করবেন, সেগুলো বারবার জীবাণু শোধন করুন।

● অসুস্থ ব্যক্তির অবস্থা শোচনীয় হলে বা শ্বাসকষ্ট হলে স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে ফোন করুন।

PID041720190426203051.jpg

করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩১ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব উত্তরণে বাজেট বরাদ্দ থেকে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করবেন তিনি।

নির্দেশনাগুলো হল-

১) করোনাভাইরাস সম্পর্কে চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ভাইরাস সম্পর্কিত সচেতনতা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে।
২) নদীবেষ্টিত জেলাগুলোতে নৌ অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩) ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) সাধারণভাবে সবার পরার দরকার নেই। চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট সবার জন্য পিপিই নিশ্চিত করতে হবে। এই রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত পিপিই, মাস্কসহ সব চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত রাখা এবং বর্জ্য অপসারণের ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
৪) কোভিড-১৯ রোগের চিকিৎসায় নিয়োজিত সব চিকিৎসক, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, অ্যাম্বুলেন্সচালকসহ সংশ্লিষ্ট সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে।
৫) যাঁরা হোম কোয়ারেন্টিনে বা আইসোলেশনে আছেন, তাঁদের প্রতি মানবিক আচরণ করতে হবে।
৬) নিয়মিত হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
৭) লুকোচুরির দরকার নেই, করোনাভাইরাসের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
৮) অন্যান্য রোগে আক্রান্ত রোগীদের যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখতে হবে।
৯) পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা। সারা দেশের সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।
১০) আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে। জাতীয় এ দুর্যোগে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগসহ সব সরকারি কর্মকর্তা যথাযথ ও সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছেন, এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।
১১) ত্রাণ কাজে কোনো ধরনের দুর্নীতি সহ্য করা হবে না।
১২) দিনমজুর, শ্রমিক, কৃষক যেন অভুক্ত না থাকেন। তাঁদের সাহায্য করতে হবে। খেটে খাওয়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য অতিরিক্ত তালিকা তৈরি করতে হবে।
১৩) সোশ্যাল সেফটিনেট কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
১৪) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন স্থবির না হয়, সে বিষয়ে যথাযথ নজর দিতে হবে।
১৫) কৃষকেরা নিয়মিত চাষাবাদ চালিয়ে যাবেন। এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রণোদনা অব্যাহত থাকবে।
১৬) সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে, যাতে বাজার চালু থাকে।
১৭) সাধারণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
১৮) জনস্বার্থে বাংলা নববর্ষের সব অনুষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে যাতে জনসমাগম না হয়। ঘরে বসে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নববর্ষ উদযাপন করতে হবে।
১৯) স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, সমাজের সব স্তরের জনগণকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি। প্রশাসন সবাইকে নিয়ে কাজ করবে।
২০)  গুজব রটানো বন্ধ করতে হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নানা গুজব রটানো হচ্ছে। গুজবে কান দেবেন না এবং গুজবে বিচলিত হবেন না।
২১) জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসন ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন করে দুস্থদের মধ্যে খাবার বিতরণ করবেন।
২২) সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী যেমন: কৃষিশ্রমিক, দিনমজুর, রিকশা/ভ্যানচালক, পরিবহনশ্রমিক, ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী, পথশিশু, তালাক/বিধবা নারী এবং হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রতি বিশেষ নজর রাখাসহ ত্রাণ সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
২৩) প্রবীণ নাগরিক ও শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২৪) দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি (এসওডি) যথাযথভাবে প্রতিপালনের জন্য সব সরকারি কর্মচারী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
২৫) নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের উৎপাদন, সরবরাহ ও নিয়মিত বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া মনিটরিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
২৬) আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত পণ্য ক্রয় করবেন না। খাদ্যশস্যসহ প্রয়োজনীয় সব পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
২৭) খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে, অধিক ফসল উৎপাদন করতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তার জন্য যা যা করা দরকার করতে হবে। কোনো জমি যেন পতিত না থাকে।
২৮) সব শিল্পমালিক, ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিপর্যায়ে নিজ নিজ শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বাড়িঘর পরিষ্কার রাখবেন।
২৯) শিল্পমালিকেরা শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে উৎপাদন অব্যাহত রাখবেন।
৩০) গণমাধ্যমের কর্মীরা জনসচেতনতা সৃষ্টিতে যথাযথ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের গুজব ও অসত্য তথ্য যাতে বিভ্রান্তি ছড়াতে না পারে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
৩১)সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

powered by expressionengine

Baca juga

;